মেয়েরা শিক্ষা দীক্ষায় অনেক এগিয়েছে- জেবা আলী (সাক্ষাৎকার)

সাক্ষাৎকারঃ মিসেস জেবা আলী 
মিসেস জেবা আলীনামেই যার পরিচয়একজন সফল শিক্ষকের প্রতিকৃতিআধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন উঁচু চূড়ায়দেশের ইংরেজী মাধ্যম স্কুলগুলোর মধ্যে যে নামটি সর্বত্র উচ্চারিত হয় সেই ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল মিসেস জেবা আলীএ পদে অধিষ্ঠিত আছেন সেই ১৯৭৯ সাল থেকেএর আগে ১৯৭৪ সাল থেকে ৫ বছর যিনি ঐ স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন করেনদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে মিসেস জেবা আলীর সাথে আমাদের খোলামেলা কথাবার্তা হয়েছেআলাপ-চারিতায় তিনি প্রথমেই গুরুত্ব দেন শিক্ষকদের আচরণ এবং দক্ষতার ওপর 

এ প্রসঙ্গে মিসেস জেবা আলী বলেন-আজকাল হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে টিচাররা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেন নাযা নিতান্তই কাম্য নয়আর এমনটি হওয়া উচিত নয়এছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে আগের সেই মধুর সম্পর্কও দেখা যায় নাশিক্ষকরা অনেকাংশেই হয়ে গেছেন কমার্শিয়ালঅনেকে দায়সারাগোছের টিচিং দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকেনআসল একজন সার্থক টিচারকে বুঝে-শুনে আর পরিবেশ-পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিতে হবেপ্রয়োজনে ক্লাসে একজন ভাল ছাত্রের পাশে একজন খারাপ বা দুর্বল শিক্ষার্থীকে বসানোর ব্যবস্থা করতে হবেএতে করে ঐ দুর্বল ছাত্র বা ছাত্রীটি তার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে ভাল শিক্ষার্থীটির সহায়তা পেতে পারেআমি যখন টিচার ছিলাম তখন এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছি মিসেস জেবা আলী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন-ক্লাসের দুর্বল শিক্ষার্থীদের বেলায় শিক্ষকদের এক্সট্রা সার্ভিস দিতে হবেপ্রয়োজনে প্রতিদিনের নিয়মিত পাঠদান শেষে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বা পৃথক সার্ভিস দেয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে 

মিসেস জেবা আলী আলাপ-চারিতায় আরও বলেন- আমাদের দেশে বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে এখন আগের মত একক পরিবারের সংখ্যা খুবই কমে গেছেবরং ছোট ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে ব্যাপকভাবেঅনেক পরিবারে দেখা যায় পিতা-মাতা দুজনেই চাকরি বা ব্যবসার জন্য দিনভর খুবই ব্যস্ত সময় কাটানফলে তারা তাদের সন্তানদের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেন নাএসব কারণে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একাকীত্বে ভোগেআর এই একাকীত্বের কারণে অনেক ছেলেমেয়ে বিপথে চলে যায় বা খারাপ হয়ে যায়আমাদের কাছে অনেক গার্জিয়ান তাদের সন্তানকে রেখে যান আর বলে যান আমরা কন্ট্রোল করতে পারছি নাএসব ক্ষেত্রে আমরা তাদের ঠিকই সামলে নেই এ প্রসঙ্গে মিসেস জেবা আলী বলেন-বাচ্চাদের অনেক ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারেএকজন অভিভাবক বা শিক্ষককে তাদের সেই সমস্যাগুলোকে ঠিকভাবে শুনতে হবেউপলব্ধি করতে হবে তার কি সমস্যা? তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবেদেশের ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মিসেস জেবা আলী বলেন-বর্তমানে রাজধানী শহর ঢাকায় ১৮০টি ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান আছেএই ১৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনি হাতেগোনা মাত্র ৪/৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালো মানের আখ্যা দিয়ে বলেন- একজন অভিভাবককে খুঁজে বের করতে হবে কোন্ ভাল আর কোনটি ভালো নয়এক্ষেত্রে তিনি বলেন- যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঋঢণঙডফ এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ভালোমানের ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 

বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার হার ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে তিনি বলেন- এদেশের মেয়েরা শিক্ষা দীক্ষায় অনেক অগ্রসর হয়েছেমেয়েদের শিক্ষা-দীক্ষায় সামাজিক ভূমিকার প্রতি আলোকপাত করে তিনি বলেন- এক্ষেত্রে সমাজের মাঝামাঝি সংশ্লিষ্ট মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে নতুবা তারা পেছনেই পড়ে থাকবেতিনি এ বিষয়ে বলেন-ধরুন একজন স্বামী বা ঘরের কর্তাব্যক্তি একটি মেয়েকে অগ্রসর ভূমিকার পেছনে ৫০ ভাগ সাপোর্ট দিতে পারেবাকী ৫০ ভাগ সেই মেয়েকে নিজেই তৈরি করে নিতে হবেএ প্রসঙ্গে তিনি নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেনআমার স্বামী সকালে সুজি অথবা হালুয়া খেতে পছন্দ করেনআমি সকালবেলা তার পছন্দমত সুজি বা হালুয়া তৈরি করে দিতে গিয়ে দেখলাম আমি সময়মত কাজে যেতে পারছি নাঅতএব আমি আমার স্বামীর পছন্দের খাবারটি রাতেই তৈরী করে রাখতে শুরু করলামফলে সকালে সময়মত কাজে যেতে আমার আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকল না মিসেস জেবা আলী ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেনযখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে পড়াশুনা করেন তখন থেকেই১৯৭২ সালে জুন মাসে তিনি ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সিনিয়র শিক্ষক পদে যোগ দেনপড়াশুনা চলাকালীন মিসেস জেবা আলী নিজেকে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত করেনদেশের পত্র-পত্রিকায় তার অসংখ্য লেখা ছাপা হয়েছেএক্ষেত্রে তিনি রোটারি ক্লাব ঢাকা, সোনারগাঁও থেকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারে অ্যাওয়ার্ড লাভ করেনতিনি গ্রেড নাইনের ছাত্রী থাকা অবস্থায় দ্যা স্কুল অব মাই ড্রিম এবং কার্টসি শীর্ষক দুটি রচনার জন্য দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করেনআমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গোল্ড মেডেল পানতিনি টেস্টিমোনিয়াল অব ম্যারিট সার্টিফিকেট লাভ করেনতার মেধাসম্পন্ন ও দক্ষতাপূর্ণ নেতৃত্বের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার ক্যামব্রীজ থেকে সিলভার মেডেল অর্জন করেন 

তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার এশিয়ার ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত আছেনতিনি আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব-এর আজীবন সদস্য এবং আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউটের আজীবন ফেলো সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেনঃ মিজানুর রহমান, ছবিঃ মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টুদৈনিক ইত্তেফাক, এপ্রিল ২৬, ২০০৭, বৃহস্পতিবার : বৈশাখ ১৩, ১৪১৪

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s