উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক সংস্কার আসছে

উদ্দেশ্য দুর্নীতি রোধ ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধ; সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন আইন; এক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের কাজ চলছে

দেশের উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক সংস্কার চলছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছে সামগ্রিক শিক্ষাকাঠামো। উচ্চশিক্ষাকে একটি গুণগতমানে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে সরকার এ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা, ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধই এ সংস্কারের উদ্দেশ্য। এই সংস্কারের আওতায় দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান নিয়মনীতি পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একাডেমিক, আর্থিক, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চত করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হাতে নেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন আইন (আমব্রেলা ল) প্রণয়নের কাজ। শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধ করতে তৈরি করা হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন। এক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের কাজ চলছে। দুর্নীতি বন্ধে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি তদন্ত করে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশী-বিদেশী শিক্ষাকেন্দ্র চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাড়ানো হচ্ছে ইউজিসি’র (www.ugc.org) ক্ষমতা।

দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অরাজকতা বিরাজ করছে। প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, স্বাধীনতার অপব্যবহার, প্রতিটি খাতে দুর্নীতি, শিক্ষার নামে বাণিজ্য দেশের উচ্চশিক্ষাকে কলুষিত করেছে। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের সুযোগ নিয়ে শিক্ষকরা একাডেমিক স্বাধীনতার অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগে চলছে স্বজনপ্রীতি আর দলীয় মতাদর্শের ব্যাপক প্রভাব। ভিসি নিয়োগ করা হয় দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যার কুফল পোহাতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। উচ্চশিক্ষার প্রসারে ১৯৯১ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন করা হলেও বিভিন্ন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় সার্টিফিকেট ব্যবসা। কয়েক বছরের মাথায় লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয় দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার ও ইউজিসিকে তোয়াক্কা না করেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠে বহু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দেশী-বিদেশী শিক্ষাকেন্দ্র। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, এসব অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে এই সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।

আমব্রেলা ল’ : ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ২৮টি স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন আইনের (আমব্রেলা এক্ট অব পাবলিক ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ ) খসড়া প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। গত মার্চে বর্তমান সরকার এ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। এ মাসের মধ্যেই এই আইন প্রণয়নের কাজ শেষ হবে বলে জানা গেছে। পরে এই আইনের খসড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হবে। এই আইনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। মূলত এই আইনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় ২০ বছর মেয়াদি যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে তারই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন আইনে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি সীমিত করার সুপারিশ থাকছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। ডিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনের নিয়ম থাকছে না। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন সীমিত করা হতে পারে। ভিসি নিয়োগ করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। এ জন্য একটি ন্যাশনাল সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির সদস্যরা হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক, সাবেক উপাচার্য এবং সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এই কমিটি শিক্ষকদের মধ্য থেকে তিনজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নামের তালিকা তৈরি করে আচার্যের কাছে প্রস্তাবাকারে পাঠাবেন। আচার্য এদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেবেন।

শিক্ষক নিয়োগ : নতুন আইনের প্রস্তাব অনুযায়ী মঞ্জুরি কমিশনের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল শিক্ষক নিয়োগের কাজটি করবেন। প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা কমিটি থাকবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে তা হচ্ছে­ একাডেমিক ফলাফল, পাঠদানের যোগ্যতা এবং গবেষণা কাজে পারদর্শিতা। চাকরিতে স্খায়ীভাবে শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হবে না। নবীণ শিক্ষকরা গবেষণা সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদও পুনর্গঠন করা হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৭ : শিক্ষার নামে বাণিজ্য বন্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী অনেকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে সাজানো হবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণ এবং পরিচালনা ও ব্যবস্খাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আনার লক্ষ্যে নতুন নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে­ কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স চালু এবং ডিগ্রি দিতে পারবে না, কোনো বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকসংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষকসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি হবে না। পরিদর্শন ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ সরকারকে ফি দিতে হবে, ভিসি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হবেন, ট্রাস্টি বোর্ডে সরকার মনোনীত দুজন সদস্য থাকবেন। সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল থাকবে। নতুন বিভাগ খুলতে ইউজিসি’র অনুমতি নিতে হবে। কোনো বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম সংক্রান্ত চুক্তি করতে গেলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন অনুমতি নিতে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ কোটি টাকা ব্যাঙ্কে জমা রাখতে হবে।

এক্রেডিটেশন কাউন্সিল : শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে এক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ কাউন্সিলের প্রধান কাজ হবে­ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়মিত ব্যবধানে তাদের নিজস্ব একাডেমিক কর্মসূচি সম্পর্কে স্বনির্ধারণী মূল্যায়ন এবং সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রদানে উৎসাহিত করা। এ ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরীক্ষক দল থাকবে যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কর্মসূচির মূল্যায়ন করবে। ফলে একাডেমিক কর্মসূচিতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা প্রত্যায়ন করা হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নিয়োগকর্তাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সম্পর্কে জানার সুবিধার্থে বহিরাগত উচ্চক্ষতাসম্পন্ন নিরীক্ষক দল কর্র্তৃক প্রদেয় ফলাফল সর্বসমক্ষে প্রচার করা হবে।

বিদেশ যেতে নতুন নিয়ম : বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক কর্মকর্তার মূল বেতন ১৫ হাজার টাকার বেশি, এখন থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে হলে তাদের প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে অনুমতি নিতে হবে। তবে যাদের বেতন এর চেয়ে কম তাদের ক্ষেত্রে তিন মাসের ছুটির অনুমতি উপাচার্যই দিতে পারবেন। গত ২২ এপ্রিল ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দফতরে পাঠানো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আগের নিয়ম অনুযায়ী, উপাচার্য নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তাদের তিন মাসের ছুটি দিতে পারতেন । এ বছর ৩১ জানুয়ারি আগের নিয়মটি বাতিল করে দিয়ে এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে অনুমতি নেয়ার আদেশ জারি করা হয়।

দুর্নীতি তদন্তে কমিটি : ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ নিয়োগ খতিয়ে দেখতে ইউজিসি পৃথক পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা বলা হলেও ইউজিসি জনবলের অভাবে আরো দেড় মাস সময় চেয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছে ইউজিসি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কাজ শেষ হয়েছে।

৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা অবৈধ : আইন লঙ্ঘন করা এবং টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করায় সরকার ৫৬টি দেশী-বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা অবৈধ ঘোষণা করেছে। গত ৮ মে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়। ইউজিসি থেকে বলা হয়েছে, এরা শিক্ষার নামে প্রতারণা করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া থেকে দূরে থাকার জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু অননুমোদিত শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে, যা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

ইউজিসি’র ক্ষমতা বাড়ছে : বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণে ইউজিসি’র ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এতদিন ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক, আর্থিক ও একাডেমিক বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারত। কিন্তু নতুন ‘আমব্রেলা’ আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান, পরীক্ষা, গবেষণাগার, ভবন নির্মাণ, তদন্তসহ সামগ্রিক বিষয়ের ওপর ইউজিসি’র ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকবে। ইউজিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামানের সময় থেকে ইউজিসি’র ক্ষমতা বাড়ানোর এই দাবিটি জোরালো হয়।

ইউজিসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সাথে সামগ্রিক বিষয়ে আলাপ করার জন্য গতকাল কমিশনে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি আইসিডিডিআরবি’র একটি প্রোগ্রামে গতকাল প্রায় সারাদিন সময় দিয়েছেন।

ইউজিসি’র সদস্য অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, উচ্চশিক্ষার গুণগতমান রক্ষায় পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। এজন্য কাজও এগিয়ে চলছে। তবে তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষক-ছাত্র-সুশীল সমাজ সবার মধ্যে একটি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ইউজিসি’র ক্ষমতা বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউজিসি প্রতিষ্ঠার সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ছয়টি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল না। বর্তমানে ৮০টির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। এজন্য ইউজিসি আইনের কয়েকটি ধারায় অবশ্যই পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে ইউজিসিকে ক্ষমতা দিতেই হবে।

মঈন উদ্দিন খান, দৈনিক নয়াদিগন্ত
ঢাকা, সোমবার, ১৪ মে ২০০৭, ৩১ বৈশাখ ১৪১৪, ২৬ রবিউসসানি ১৪২৮

UGC on Wikipedia:
http://en.wikipedia.org/wiki/University_Grants_Commission_(Bangladesh)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s