সাড়ে সাত হাজারের ভেলরি, আড়াই লাখের শফি সামি, আর দুই পয়সার আমরা..

আরিফ জেবতিকের খেরোখাতা (ব্লগ) থেকে
http://www.somewhereinblog.net/blog/Arif-Jebtikblog/28712437

একটি সত্য ছবি:

তারুণ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই দেশ ঘুরে গিয়েছিলেন ৬৯ সনে।তারপর বোকা মহিলাটি আবার এদেশে ফিরে এসেছিলেন ৭২ সালে।রক্তাক্ত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের ফিজিওথেরাপি দিতে ।কেউ তাকে ডেকে আনেনি।তবু তিনি চলে এসেছিলেন।পাগলী আর ফিরে যাননি।

৭৯ সনে অনেক চেয়ে চিন্তে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিত্যক্ত গুদাম ঘরখানি পেলেন।ঝেড়েমুছে শুরু করলেন একটা ছোট,খুবই ছোট ফিজিওথেরাপির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।সি.আর.পি।

তারপর সেই বোকা মেয়েটি তার সীমিত সাধ্যে একখান সাইকেল চেপে ঘুরতে লাগলেন দুয়ারে দুয়ারে।মাথা নিচু করলেন,হাত পাতলেন,অপমানিত হলেন,গঞ্জনা সইলেন,হতাশ হলেন তবু হাল ছাড়লেন না।নিজের জন্য নয়,সেই বোকা মানুষটি সব করলেন আমাদের জন্য।মেরুদন্ড ভেঙ্গে পড়ে থাকা কিশোরী,বাবার কাধে ভর করে চলা চলৎ শক্তিহীন তরুন,বাড়ি ফেরার পথে দূর্ঘটনায় পড়ে পঙ্গু হওয়া পরিবারের একমাত্র লোকটা…তাদের জন্য কেঁেদ ফিরতে লাগলেন …।তারপর এখানে সেখানে ভাড়া বাড়ি খুজে খুজে হয়রান হলেন,তবু তার মানব সেবা শেষ হলো না।

এভাবেই একদিন মহীরুহ হলো তার সংগঠনটি।সি.আর.পি পরিনত হলো দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠানে যেখানে ঠাই হলো মেরুদন্ড ভাঙা অসহায় মানুষের,ক্রাচে ভর করে চলা,বুকে হেটে চলা,উবু হয়ে চলা,গড়িয়ে চলা অজস্র মানুষের।আমার দেশের মানুষের।

চলার পথে পিছু ফিরে একদিন সেই পাগলী দেখলেন পাগলী মেয়ে থেকে তিনি পাগলী প্রৌড়াতে রূপান্তরিত হয়েছেন,কিন্তু জীবনের পথে হয়নি সংসার…।

দুইটি মেয়েকে দত্তক নিলেন তিনি,পঙ্গুমেয়ে,পক্ষাঘাতগ্রস্ত মেয়ে।আর সবার মতোই তাদেরকে কাজ শেখালেন তিনি,তারপর চাকরি দিলেন সি.আর.পিতে।

এদেশে এন.জি.ও বলুন, কনসালটেন্সী ফার্ম বলুন আর যাই বলুন,সংগঠনের বড়ো কর্তার কিন্তু বেতনটা হয় ডলারে।টাকার অংকে সেই বেতন শুনে আমরা সাধারন মানুষ ভিমরি খাই।আমাদের কল্পনাতেও কোনদিন এতোটাকা ধরা দেয় না।

এই বিদেশীনি পাগলি কতো বেতন নেন জানেন?সাড়ে সাত হাজার ! না ডলার নয়,টাকা!! মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকায় চলে তার সংসার।বনানী গুলশানের যেকোন সাহেবের ড্রাইভারের বেতন থেকে দেড় হাজার টাকা কম!
সেই পাগলী মহিলার নাম ভেলরি এ.টেইলর।

অন্যছবি:

আমাদের এক সাবেক সচিব নামের আমলা আছেন।তিনি তার অভিজ্ঞতা দেবার নাম করে ঢুকে গেলেন সি.আর.পিতে।বিদেশী দাতাদের সাথে তার আলাদা খাতির।হবেই না বা কেন,তিনি আমলা ছিলেন বটে।সেই দাতাদের কাছে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি বিছিয়ে দিলেন তিনি।সি.আর.পিকে তিনি এবার নাকি গুছিয়ে দেবেন। শুধুই সমাজ সেবা,আর কিছু নয়।তাই তিনি নাম কা ওয়াস্তে একটা বেতন নিবেন সাব্যস্ত করলেন।কতো জানেন? মাসে আড়াই লক্ষটাকা!!

প্রতিবাদ করলেন ভেলরি।
মানব সেবার সংগঠনে যদি একজনই আড়াইলক্ষ টাকা বেতন নেন,তাহলে প্রতিষ্ঠান চলবে কেমনে?(আর এখানেই কি তিনি ভুলটা করলেন।)

টাকা রোজগারের ব্যবস্খাও করে ফেললেন মান্যবর আমলা।রোগীরা টাকা দেবে।যে সংগঠনটি ২৫ বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে,সেই সংগঠনে এখন উচ্চ মূল্যে চিকিৎসা বিক্রী হচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে,এপোলো আর বামরুনগ্রাদের শাখা খুলে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে সবাই,আমলা সাহেব করলে দোষ?
দেশের পক্ষাঘাতগ্রস্খ গরীব মানুষের শেষ আশ্রয় স্খল,এশিয়ার সাড়া জাগানো একটি প্রতিষ্ঠান ক্রমেই পরিনত হচ্ছে বড়োলোকের ক্লিনিকে।

সবকিছু বদলাচ্ছে,দ্রুত বদলাচ্ছে:

ঘটনা ঘঠছে খুব দ্রুত।
ইতিমধ্যেই সমন্বয়কের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে ভেলরিকে।তিনি এখন আয়ব্যয়ের হিসাব দেখতে পারবেন না।
এক অকস্মাত চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানের চেকবুক থেকে স্বাক্ষরের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে ভেলরির।
ইয়ার বুকে রাজ্যের যতো হোমড়া চোমড়া আর আমলাদের বাণী ছাপা হয়েছে,ছবি ছাপা হয়েছে,কিন্তু ভেলরির নামগন্ধও নেই সেখানে।
একের পর এক দ্রুত বিভিন্ন সেকশনে বদলি করে হয়রানি করা হচ্ছে ভেলরির পালিতা পক্ষাঘাতগ্রস্খ অসহায় মেয়েটিকে।ভেলরিকে করা হয়েছে কর্মহীন, ক্ষমতা হীন।নিজের প্রতিষ্ঠানে আজ তিনি নিজেই শোপিস।

তিনি নাকি দূর্ণীতি করেছেন? কিন্তু তন্ন তন্ন করেও একটা দূর্ণীতির প্রমান বের করতে পারছেন না আমলা মহাশয়।

তিনি নাকি ম্যনেজমেন্ট বুঝেন না। পরিত্যক্ত গুদাম থেকে ৪০০ বেডের হাসপাতাল একাই গড়ে তুললেন যে নারী,তাকে এখন শিখতে হবে ম্যানেজমেন্ট?
হাহ্!

এই আমলা মহোদয়ের নামের আগে আমি শুওরের বাচ্চা শব্দটি যোগ করে শুওরের অপমান করতে চাই না।
আমি শুধু তার নামটি বলে দিতে চাই।তার নাম শফি সামি।

আমরা যারা দুই পয়সার মানুষ:

জনাব শফি সামি,জানি না এই লেখাটি আপনার চোখে পড়বে কি না।তবু আমি আপনাকেই বলছি।

আমি খুব সাধারন একজন মানুষ,খুবই সাধারন।আমার সাধ্যের বড়ো অভাব।তবু আমি আমার সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে আপনাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করব।আমার জীবদ্দশায় এতোবড়ো একটা অন্যায় আমি মুখ বুজে মেনে নেব না।

আমি আপাতত:পাগলের মতো ইমেইল করে যাবো সবগুলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে।আমি তাদেরকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব,এতো বড়ো একটা অন্যায়ের প্রতিকারে তারা যেন এগিয়ে আসেন। এই কলংকে বোঝা যেন আমাদের ঘাড়ে না চাপে।

আমি এই মূহুর্তে ইমেইল করব সেনা প্রধানের কাছে,ইমেইল করব তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের কাছে,ইমেইল করব বৃটিশ আর আমেরিকান রাষ্ট্রদূতদের কাছে,ইমেইল করব এমনেস্টির কাছে,টি.আই.বির কাছে,ইমেইল করব সি.আর.পির যে অগনিত দাতা আছেন দেশের বাইরে সেই সব দাতাদের সংগঠন গুলোর কাছে।বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মূল দাতা প্রতিষ্ঠান আর জার্মানির দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে।ইংল্যান্ড আর জার্মানির এই দুইটি প্রতিষ্ঠানকে আমি ফোন করেও অনুরোধ করবো,সত্য জিনিষটা বুঝতে।

আমি এই আবেদন ছড়িয়ে দেব আমার বন্ধুদের মাঝে,তারা ছড়িয়ে দেবে তাদের গ্র“প মেইলে।এভাবেই চলতে থাকবে।এক থেকে দুই,শত থেকে সহস্র,লক্ষ থেকে নিযুত ই-মেইল,ফ্যাক্স আর ফোনে আমি কাউকে শান্ত থাকতে দেব না।
অগনিত মানুষ ফোন করবে লন্ডনের আর জার্মানির সেই প্রতিষ্ঠান দুটিতে।ভেলরি আমাদেরকে দিয়েছেন তার জীবনের ৩৬টা বছর।এখন আমাদের দেবার পালা।দিনে আমি কমপক্ষে ৩৬ মিনিট সময় দেব এই কাজে..সেটাই একসময় বিশাল হয়ে উঠবে।

আমি হয়তো আরো অনেক কিছুই করব,অথবা করতে ব্যর্থ হবো।
তবু সফি সামি আপনি জেনে নিন,আমার মতো দুই পয়সার মানুষের হয়তো একা কিছু করার ক্ষমতা নেই,কিন্তু দুই পয়সা দুই পয়সা যূথবদ্ধ হয়েই আমি থেকে আমরা হবো,আর আপনার আড়াই লক্ষটাকার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবো।আপনি সেটা দেখে যাবেন ইনশাআল্লাহ!

(কেউ যদি এই প্রচেষ্ঠায় শরিক হতে চান,তাহলে সি.আর.পির সবথেকে বড়ো দুইটি দাতা প্রতিষ্ঠানের নামঠিকানা নিচে দিলাম।বাকি মেইল ঠিকানাগুলোও আমি জানিয়ে দেব।)

ইংল্যান্ডে :
gillian@phillips111.freeserve.co.uk
Gillian Phillips, FCRP Administrator
Email: gillian@phillips111.freeserve.co.uk
Tel. no. 0118 940 1294

জার্মানিতে:
Elke Sandmann
Präsidentin
Freundeskreis des CRP, Bangladesch
E-Mail: eksandmann@gmx.de
Tel: 089/6709060

******************

দাতব্য প্রতিষ্ঠান সিআরপি পরিণত হয়েছে ক্লিনিকে

হামিম উল কবির

দৈনিক নয়া দিগন্তে রোববার, ২৭ মে ২০০৭ প্রকাশিত প্রতিবেদন
http://www.dailynayadiganta.com/2007/05/27/fullnews.asp?News_ID=24231&sec=1

দরিদ্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের একমাত্র ভরসা হিসেবে সিআরপি এত দিন পরিচিত থাকলেও এখন টাকা দিয়ে সিট ভাড়া করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের। একসময় পক্ষাঘাতগ্রস্তরা এ কেন্দ্রে ভর্তি হলেই একটি হুইল চেয়ার বিনামূল্যে পেতেন। এখন ভর্তি হওয়ার আগেই নিজ খরচে রোগীকে হুইল চেয়ার কিনে ভর্তি হতে হয়। দরিদ্রদের বিনা খরচে চিকিৎসা দেয়ার যে দর্শন ছিল সিআরপি’র, এখন তা পরিণত হয়েছে একটি ব্যয়বহুল ক্লিনিকে। একজন নিবেদিতপ্রাণ ইংরেজ মহিলা জীবনের ৪০ বছর ধরে তিল তিল করে যে মেধা, বুদ্ধি ও ঘাম ঝরিয়ে তৈরি করেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘সিআরপি’, তাকেই কিছু কুচক্রী ষড়যন্ত্র করে হীনস্বার্থ চরিতার্থের জন্য কৌশলে বের করে দিতে চাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠান থেকে। তিনি ফিজিওথেরাপিস্ট ভ্যালেরি এ টেলর। প্রায় চার দশক ধরে এ মহিলা তার জীবনের সোনালি সময়গুলো কাটিয়েছেন সিআরপি প্রতিষ্ঠায়। মাসিক সাড়ে ৭ হাজার টাকা নামমাত্র পারিশ্রমিক নিয়েই তিনি এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করিয়েছেন।

অন্যদিকে বছরে ৩০ লাখ টাকারও (২২ হাজার পাউন্ড) বেশি বেতনধারী ব্যক্তিটি ২০০৫ সালে সিআরপিতে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে যোগদানের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে ম্যানেজিং ট্রাস্টির পদ সৃষ্টি এবং হাসপাতাল পরিচালকের পদ বিলুপ্তির জন্য প্রচেষ্টা চালান। গোপনে একসময় ট্রাস্টি বোর্ডের চার সদস্যের যোগসাজশে একটি রেজুলেশন করিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সি এম শফি সামিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সিআরপি ট্রাস্টের বিধানে এ ধরনের নিয়োগের কোনো বিধি না থাকা সত্ত্বেবও শফি সামিকে সিইও করা হয়। সাত সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের অপর তিন সদস্য এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না বলে জানিয়েছেন ভ্যালেরি টেলরের সাথে ঘনিষ্ঠ একজন। এ তিনজনের একজন ভ্যালেরি নিজে এবং অপর দুজন হলেন­ সাইদুর রহমান ও মুশতাক আহমেদ। গোপন সভায় রেজুলেশন অনুযায়ী শফি সামি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেও তিনি কোনো প্রকার নিয়োগ ছাড়াই এ দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। উল্লেখ্য, সিআরপিতে ট্রাস্ট আইনে কোনো ট্রাস্টির বেতন নেয়ার সুযোগ নেই। সিআরপি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় শফি সামির প্রধান নির্বাহী পদে নিয়োগ ও উচ্চ হারে বেতন নেয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করার প্রস্তাব দেয়া হলে শফি সামিসহ তার পক্ষের ট্রাস্টিরা তা এড়িয়ে চলেন। অন্যদিকে ভ্যালেরি এ টেলরের প্রধান উপদেষ্টা কাম-সমন্বয়কের দায়িত্ব সঙ্কুচিত করে দেয়া হয়। এরপর চলতি মাসের ১৪ তারিখে সিআরপি’র অর্গানোগ্রামে সমন্বয়কের পদটিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়। যুক্তরাজ্যস্খ সিআরপি’র বìধু প্রতিষ্ঠান অথবা দাতাদের বুঝিয়ে বছরে ৩০ লাখ টাকার মোটা বেতন মঞ্জুর করিয়ে নিয়েছেন শফি সামি। এত মোটা বেতন নিয়ে বাংলাদেশ তো বটেই বিদেশেও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাজ্য থেকে কোনো সংগঠন অথবা দাতা সংস্খা বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তির বেতন নির্ধারণ করে দিতে পারে না। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু ৩০ লাখ টাকা বেতন নিয়েও শফি সামি প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজনীয় সময় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি একটি কাজই প্রধান নির্বাহী হিসেবে করতে পেরেছেন, তা হলো সিআরপি থেকে ভ্যালেরিকে ধীরে ধীরে বের করে দেয়া এবং উপদেষ্টা ও সমন্বয়কের পদটি বিলুপ্ত করে তা-ই প্রমাণ করেছেন।

এছাড়াও সাপ্তাহিক ২০০০ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দেখুন…

এই লিঙ্ক থেকে ডাউনলোড করতে পারবেনঃ
http://www.shaptahik2000.info/issues/2007/year-10/issue_02/pdf/pp20070525.pdf

***************************

সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন : থানায় জিডি

হামিম উল কবির

দৈনিক নয়া দিগন্তে আজ সোমবার, ২৮ মে ২০০৭ প্রকাশিত প্রতিবেদন

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি এ টেইলর। তার প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রে এখন তিনি নিজেকে নিরাপদ বোধ করেন না। তাই তিনি নিরাপত্তা চেয়ে সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি (নং ১২২২) করেছেন। গত ১৯ মে দায়ের করা ওই ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি ভ্যালেরি টেইলর, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সমন্বয়কারী সিআরপি, চাইনান, সাভার, ঢাকা, দীর্ঘদিন যাবৎ সিআরপি’র সাথে নি:স্বার্থভাবে কাজ করে আসছি। গরিব পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য সাভারসহ সারাদেশের এবং বিশ্বের অনেক দানশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় গড়ে তুলেছি এই প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতালের ভেতর আমি আমার অসুস্খ কন্যাকে (পালিত) নিয়ে অতি সাধারণভাবে বসবাস করে আসছি রোগীদের সেবাদানের জন্য। সম্প্রতি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আমার উল্লিখিত দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ থেকে সরানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে আমি আমার গড়া প্রতিষ্ঠান সিআরপিকে বিনষ্ট করার অপচেষ্টার অনুমান করছি এবং সেই সাথে এই পরিস্খিতিতে আমার ও আমার জানমালের নিরাপত্তার অভাব বোধ করছি।’

গত ১৪ মে সিআরপি’র সাত সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে চারজনের (শফি সামি, অব: মেজর জেনারেল নুরুল হক, লিনা আলম ও বিশ্বনাথ চৌধুরী) উপস্খিতিতে একটি ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে (রেফারেন্স : সিআরপি/এডমিন/৪৮৩/০৭) রেজুলেশন তৈরি করে ভ্যালেরির পদবি ‘উপদেষ্টা ও সমন্বয়ক’ থেকে শুধু উপদেষ্টা পদবিটি রেখে ‘সমন্বয়ক’ পদটি বিলপ্ত করা হয় এবং সমন্বয়ক হিসেবে ভ্যালেরি যে পদবিটি অতীতে ধারণ করতেন তাও অর্গানোগ্রাম থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অব: মেজর জেনারেল মুহাম্মদ নুরুল হকের (সিআরপি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান) সভাপতিত্বে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। অপর তিনজন সদস্য সভায় উপস্খিত হননি। এ ব্যাপারে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মুশতাক আহম্মেদ জানিয়েছেন, সিআরপি’র ট্রাস্টি বোর্ডের পাঁচ সদস্য আইন অনুযায়ী ট্রাস্টি পদে আছেন।

শফি সামি ও লিনা আলম অবৈধভাবে ট্রাস্টি বোর্ডে আছেন বলে তিনি এবং ভ্যালেরি ও সাইদুর রহমান অপর চারজনের সাথে বৈঠকে বসেননি। মুশতাক আহম্মেদ জানিয়েছেন, শফি সামি ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসেবে সিআরপিতে আছেন।

সিআরপি ট্রাস্টের বিধানে এ ধরনের কোনো পদ নেই। অপর সদস্য লিনা আলম ব্রিটেনে সিআরপি’র দাতাসংস্খা এফসিআরপি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। তিনি আবার সিআরপি’র ট্রাস্টি হতে পারেন না। আর এ সুযোগে একজনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় চারজন ট্রাস্টি ভ্যালেরিকে সমন্বয়কের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

ভ্যালেরি গতকাল রোববার এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, গত ১৪ মে তাকে সিআরপি’র সমন্বয়কের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এ সংবাদটিও কোনো অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে তাকে জানানো হয়নি। তিনি জেনেছেন সংবাদপত্রের মাধ্যমে।

*****************

ঝামেলামানুষ-২; ভ্যলেরি টেইলর, আপনাকে

জানালা’র ব্লগ
http://www.somewhereinblog.net/blog/Janalablog/28711887

মেয়েটা চায়ে চুমুক দিয়েই বলে, ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবার বানিয়ে দাও। সত্যিই ঠান্ডা। আমি চুপচাপ আরেক কাপ নিয়ে আসি। বলতে ইচ্ছে করে, চা সামনে রেখে একঘন্টা বসে থাকলে এমনি তো হবে।

মেয়েটাকে আমি অপছন্দ করি খুব। এতো কথা বলে। বিরক্ত করে সারাক্ষন। কিংবা আমিই বিরক্ত হয়ে যাই খুব তাড়াতাড়ি। মাঝে মাঝে চেষ্টা করি। বিরক্তি কমে না।

পোস্টার দেখেই তার বিকরিত হাসি টা দিল। আমিও কি মেলায় যাবো? তাকে নিয়ে যেতে হবে আমাকেই। বিরক্তি যথাসম্ভব কমিয়ে বললাম, যাবে। খুশিতেই বোধহয় পায়ে জোর এসে গেলো তার। পা টাকে টেনে টেনে গেলো আরেকজনের কাছে। ঘরের ভেতর হুইল চেয়ার ছাড়াও হাটতে পারে সে। কাকে যেন বলছে, ভাই বলেছে আমাকে কাল মেলায় নিয়ে যাবে। আমি কখনো মেলায় যাইনি। কেউ নিতে চায়না।

পরের দিন আমার মেজাজ খারাপ খুব। ছুটিতে যাবার আগে শেষ দিন। কত কাজ রয়ে গেছে জমা। ঘুম থেকে উঠেই তার দাবি, চুল বেধে দাও। ঠান্ডা চোখে একবার তাকাতেই চলে গেলো চুপচাপ। একটু পরে আবার এসে বললো তুমি মেলায় যাবে না? হাসি পেয়ে গেলো এবার। বেচারী ভয়ে জিগ্গেস করতে পারছেনা সে নিজে সত্যি মেলায় যাচ্ছে কি না।

দুপুর থেকে ব্রিষ্টি ভীষন। আমার ভালোই লাগছে। গরম কমে গেছে অনেক। আজেবাজে মেলায় যেতে হবেনা।

সে আবার এলো আমার কাছে। তুমি মেলায় যাবেনা? আমি বললাম, দেখি। তাকে কেউ বলেনি কখন যাওয়া হবে। তবু বাইরে যাবার কাপড় পরা। কে যেন লিপস্টিক ও লাগিয়ে দিয়েছে একটু। সে বসলো একটু দুরে। আমি যথারীতি বিরক্ত। কাজের সময় অহেতুক কথা একদম পছন্দ করি না আমি হঠাত খেয়াল করি যেখানে যাই, সে আসছে সাথে সাথে। এক ফাকে বোনকেও ফোন করে একবার;আমি না মেলায় যাচ্ছি। এমনকি অফিস রুমেও। তুমুল বিরক্ত নিয়ে বলি, কিছু চাই তোমার? সে বলে আবারো, তুমি মেলায় যাবে না? আমি একটু চিন্তায় পড়ে যাই। ব্রিষ্টি কমে যায় যদি। সে আমার সামনে একটা সোফায় বসে থাকে। চোখের আড়াল করে না। যদি তাকে ফেলে মেলায় চলে যাই।

সে বসে বসে ঝিমায়। আমি নিশ্চিত হই। ব্রিষ্টি কমেছে। তবু এ অবস্থায় মেলায় যাওয়া সম্ভব না। মাঝে মাঝে শুধু সে চোখ খুলে দেখে, আমি আছি কি না। একা একা মেলায় চলে গেছি কি না।

বিকেলে হই চই করে আসে সবাই। তাদের কারো হুইল চেয়ার নেই। অনেক ভালো হাটে তারা। কোন বাধা নেই তাই মেলায় যেতে। সবাই কে নিষেধ করে দেই তাকে কিছু না বলতে। চলে যায় সবাই। সে হয়তো বোঝে কিছুএকটা। আস্তে আস্তে এসে বলে, তুমি মেলায় যাবেনা? আমি আবার বলি, দেখি। পা টেনে টেনে চলে যায়। ঘুমিয়েই পড়ে ঝিমাতে ঝিমাতে। লালা গড়িয়ে পড়ে তার হা করা মুখ দিয়ে ।

প্রিয় ভ্যালেরি, এটা গল্প নয়। সত্যি। আমি এমন করেছিলাম। আমি সত্যি এমনি করি। আচ্ছা, আপনি হলে কী করতেন?

আপনি তো অনেক পেশাদার ভ্যালেরি। এরকম ব্রিষ্টি ভেজা কাদা মাখা রাস্তায় হুইল চেয়ার টানা যে কি পরিমান কষ্ট, কি পরিমান বিপদজনক, জানেন আপনি। তবু কী আপনি করতেন না কিছু?

আপনি হয়তো একটা গাড়ী জোগাড় করতেন। ঘুরিয়ে আনতেন তাকে মেলার আশেপাশে অথবা অন্য কোথাও। অথবা টুকটাক গল্প করতেন তার সাথে। সে হেসে ফেলতো আপনার কোন একটা কথায়। ভুলে যেতো মেলায় যেতে না পারার দুঃখ। অথবা কোন কিছু করতে না পারলে আপনি তাকে বুঝিয়ে বলতেন সমস্যাটা। বোকা তো না সে। ঠিক বুঝতো। আমিও পারতাম। করিনি। আপনি করতেন।

আচ্ছা ভ্যালেরি, এতোদিনের একটা কাজ থেকে আপনাকে সরিয়ে দিতে চাইছে কেন ওরা? আপনি কি প্রতিষ্ঠানের অনেক টাকা নিজের একাউন্টে ভরে নিয়েছেন? কী করেছেন এত টাকা দিয়ে? বিদেশে, নিজের দেশে কোন সম্পদ নেই কেন আপনার? হ্য়তো আছে। আমরা জানিনা। আমি আপনার জায়গায় হলে কবেই ফিরে যেতাম দেশে। বসে বসে খেতাম। কেন পরে থাকতাম এই কাদা মাখা দেশে কতগুলো খোড়া মানুষের মাঝে?

আপনাকে দুর থেকে দেখেছিলাম একবার। চিনতাম না তখন আপনি কে। শুধু ফরসা রমনী দেখবো বলে দেখেছিলাম। মাইক হাতে নিয়ে বলেছিলেন, আমি খুব দুঃখীত; এতোদিন বাংলাদেশে থেকেও বাংলা শিখতে পারিনি।

এটা আপনার বড় অপরাধ হতে পারে। ওরা একবার বললে আমিই আপনাকে বের করার ব্যবস্থা করতাম।

আচ্ছা চ্যারিটি তো অনেক আছে। আপনার সাংগঠনিক ক্ষমতা ভালো। পশুর মতো খাটতে পারেন। চাইলে কি একটা ভালো কাজ আপনি পেতেন না? ভালো পদবী, ভালো বেতন। ভাগ্য ভালো হলে একটা নোবেল প্রাইজ।
কী লাভ হলো কিছু গরীব চাষাভুষোর সেবা করে?

একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি ভ্যালেরি। আপনি কি বিয়ে করেছেন?
কে পাগল আছে এমন বিয়ে করবে আপনাকে?
দেখতে তেমন সুন্দর নন। যখন ছিলেন তখন তো বোকার মতো চলে এসেছিলেন এই দেশে। ভেতর – বাইরের সমস্ত সুন্দর ছড়িয়ে দিয়েছেন কিছু হাত পা ছেড়া মানুষর জন্য। শুন্য থেকে বিশাল কিছু শুরু করার বোকাটে মেয়ে তেমন ছেলে পাবেই কোথায় একটা? তবু যদি বিয়ে করেই থাকেন আপনি। ঐ লোকের জন্য আমার রীতিমতো কষ্ট হ্য়। কতটুকু সময় আপনি রাখেন নিজের অথবা পরিবারের জন্য?

আচ্ছা ভ্যালেরি,সি আর পি ছাড়লে কোথায় যাবেন আপনি? বয়স হয়ে গেছে,তবু কোথাও ভালো একটা চাকরী নিশ্চয়ই পাবেন (আমাদের এখানে জয়েন করবেন? আমরা লোক খুজছি) কিন্তু পারবেন কি করতে?
আরে ২৫ বছর থাকলে কয়েদিরও জেলখানার প্রতি মায়া জন্মে যায়। আর আপনি গেলে যাবেন তো সারা জীবনের সন্চয় ছেড়ে। আপনার সন্তানদের ছেড়ে। কী করে থাকবেন আপনি?

বংলাদেশ বা অন্য কোথাও কটা লোক যেচেপড়ে সাহায্যকরেছে আপনাকে? আপনিই তো ভিখারির মতো নতজানু হয়ে ভিক্ষা চেয়েছেন কিছু ভিখারির জন্য।

তবু আপনার ভাগ্য ভালো ভ্যালেরি। আপনার গায়ের রং সাদা। আমাদের মতো বাদামী হলে এতোদিনে আপনার রিমান্ড হয়ে যেতো। কিংবা আপনি হতেন আরেকজন চলেশ রিশিল।

ভ্যালেরি, আমি আমার সরকার, সরকারের প্রতিটা লোক এবং প্রতিটা বাঙালিকে প্রচন্ড বিশ্বাস করি। তারা যদি বলে ২৮ বছর পর আপনি কোন পদের যোগ্য নন। আপনি নন। তারা যদি বলে আপনি যাবেন। আপনি যাবেন।
তারা যদি বলে আপনি খারাপ। আপনি খারাপ।

ভ্যালেরি টেইলর, আপনার চলে যাওয়াই উচিত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s