৫৬ বিশ্ববিদ্যালয় অবৈধ, অতঃপরঃ

দৈনিক ইত্তেফাক, জুন ১১, ২০০৭, সোমবার

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পতা ও আসন সংকটের কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ভরসাস্থল বলে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যাহত ছাত্র রাজনীতি, সন্ত্রাসসহ সেশনজটের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের জীবন দীর্ঘায়িত হওয়ায় অভিভাবক মহল শংকিত। আবার কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে এর শিক্ষার মান নিয়েও বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে। আর যুগের চাহিদাকে সামনে রেখে বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে ৫৪টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা চালু হয়েছে। যারা অনেক ক্ষেত্রেই এদেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেখভাল করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের। সম্প্রতি ৮ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইন লংঘন করে স্থাপিত ৫৬টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে অবৈধ ঘোষণা করেছে। এতে করে একদিকে যেমন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন, অনুরূপভাবে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাকারীরাও।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নানাবিধ সমস্যা, সমস্যা নিরসনে ইউজিসি’র ভ‚মিকা, বিদ্যমান ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ইউজিসি’র প্রতিক্রিয়া পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো।

০ অবৈধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবে না
০ ইউজিসি ২০ বছর মেয়াদী উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা করছে
০ সংসদ কার্যকর না থাকায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারী করা হবে
০ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধন আইনের ধারা-৫ বহাল রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে তা বৈধ হবে না

সরকারের অনুমোদন ছাড়া বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খুলে উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি দেওয়া যাবে না। সরকারের অনুমতি নিয়েই ঢাকার বাইরে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খুলতে হবে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও এই আইনের খসড়া সংশোধনীতে এ কথা বলা থাকলেও তা এতোদিনে কার্যকর করা যায়নি নানাবিধ কারণে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নৈরাজ্য, বিশৃংখলা ঠেকাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা দু’বছর ধরে ঝুলে থাকা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের উদ্যোগী হয়েছেন। জোট সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেয় তা অজ্ঞাত কারণে পাশ হয়নি।

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সমস্যা ও অরাজকতার অবসান চায়। এ লক্ষ্যে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে।

দু’বছর চেষ্টা করেও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন না করতে পারার কারণ সম্পর্কে ইউজিসি’র সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আসাদুজ্জামান জানান, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মালিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আইনটির সংশোধন চায়নি, যে কারণে খসড়া চুড়ান্ত হয়নি। কিন্তু বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ সব চাপের উর্ধ্বে থেকে বেসরকারী পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষাকে রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে।

অবৈধ ঘোষিত ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কতোজন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে এর সঠিক কোন হিসেব মঞ্জুরি কমিশনের কাছে নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে এদের মোট সংখ্যা ১৮-২০ হাজারের মতো হবে। আর এরই মধ্যে এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে এর সমপরিমাণ। এ প্রসঙ্গে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি (ডিআইআইটি)’র এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, ১৯৯৫ সালে ডিআইআইটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অর্থাৎ সুদীর্ঘ ১২ বছর ধরে এনসিসি’র অধীনে আমরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছি। ইতোমধ্যে এ প্রতিষ্ঠান থেকে ৬৫০ জন গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে আর ১৪০০’র মতো শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা ও এডভান্স ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছে। এদের সবাই হয় চাকরি করছে না হয় বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে গেছে। বর্তমানে ডিআইআইটি’র শিক্ষার্থী ৬০০’র অধিক। ইউজিসি’র নিষেধাজ্ঞার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা শঙ্কিত রয়েছে। ডিআইআইটি’র কমপক্ষে ৬০০’র মতো শিক্ষার্থী এখন বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস বা পিএইচডি করছেন। ১২ বছর ধরে আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন আসেনি। এখন কেন আসলো তা বোধগম্য নয়। ইউজিসি’র উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের প্রসেসটি ঠিক নয়। আমাদের দেশে নাম সর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা শুধু সার্টিফিকেট বিক্রি করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে। যাদের পড়াশোনা, ল্যাগুয়েজ অবকাঠামো প্রভৃতি বিবেচনায় এনে তারপর যদি নিষিদ্ধ করা হতো তবে এ সংখ্যা হতো ৪০। তাই আমরা বলবো, এ মাসের মধ্যেই যতোদ্রæত সম্ভব মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরেকটি তালিকা ইউজিসি যেন সংবাদপত্রে প্রকাশ করে তাহলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দুঃচিন্তামুক্ত হবে। ডিআইআইটি গত কয়েক বছর ধরে মঞ্জুরী কমিশনকে চিঠি দিয়েও এ ব্যাপারে কোন উত্তর পায়নি। প্রতি বছরের ন্যায় গত ২০০৫ সালে এনসিসি ইউকে’র আয়োজনে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত ৪৫টি দেশের ৪০০ ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। যাতে ডিআইআইটি’র অর্থায়নে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক ও ইউজিসির সদস্য ড. মাহফুজুল হক অংশগ্রহণ করে এনসিসি ‘ইউকে’র পড়াশোনার মানের ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

অবৈধ ঘোষিত আরেকটি প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিয়ান কলেজ এর চেয়ারম্যান এম কে বাশার জানিয়েছেন, ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর তারা মঞ্জুরি কমিশনের কাছে অনুমোদন চেয়ে কোন উত্তর পাননি। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমোদন চেয়ে চিঠি দেবার পর উত্তর এসেছে ‘মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের ক্যাম্পাস স্থাপনের নীতিমালা নেই’। তিনি বলেন, আমরা যুগোপযোগী কর্মমুখী কিছু কোর্স করিয়ে থাকি যা এদেশের মানুষের কল্যাণে। তিনি জানান, এই পর্যন্ত ১০০ জন শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করেছে যারা দেশে বিদেশে চাকরির ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অন্যদিকে ক্যামব্রিয়ান কলেজ বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে বর্তমানে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষা দিবে। সুতরাং অবৈধ ঘোষণা করায় এই এইচএসসি শিক্ষার্থীরা ও অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এ ব্যাপারে মঞ্জুরী কমিশনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের কথা উঠেছে। এর কার্যক্রম কতোদূর? এ আইনের প্রধান সংশোধনগুলো কি হবে বলে মনে করছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ আইনের প্রধান সংশোধনী কি এ নিয়ে এ মুহ‚র্তে কোন মন্তব্য করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কমিটি আইনের সংশোধন বিষয়ে কয়েকটি সভায় মিলিত হয়েছে। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই আইনের সংশোধন চূড়ান্ত হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, এই আইন চূড়ান্ত সংশোধন করার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় কদের সাথে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষক বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতামতকে সবচেয়ে প্রাধান্য দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অবৈধ ঘোষণা সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশে এ পর্যন্ত যে ক’টি (৫৬টি) বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত হয়েছে তার প্রতিটিকে কতিপয় শর্তে সাময়িক স্থাপন ও পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তন্মধ্যে শিক্ষার ন্যূনতম মান রক্ষা করতে নাপারা ও সাময়িক অনুমোদনপত্রের অধিকাংশ শর্ত পালন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ০৫টি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত শিক্ষার গুণ, মান ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধি এবং এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে বিশ্বমান পর্যায়ে উন্নতি করার জন্য বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন এবং এক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পার্লামেন্ট কার্যকর না থাকায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধন আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে এবং এক্রিডিটেশন কাউন্সিল একটি রেগুলেশন হিসেবে জারী করা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সিলেবাস, শিক্ষকবৃন্দের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা, লাইব্রেরি-ল্যাবরেটরি সরেজমিনে পরিদর্শন ইত্যাদির উপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনের ব্যাপারে চাপ দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যে ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোর প্রধান সমস্যা হচ্ছে তারা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২ এর সংশোধন আইন ১৯৯৮ এর অধীনে সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করেনি। সংশোধিত আইন ১৯৯৮ এর ধারা-০৫ নিম্নরূপ ঃ

‘এই আইনের অধীনে সরকারের নিকট হইতে প্রয়োজনীয় সনদপত্র অর্জন না করিয়া কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বা পরিচালনা করা যাইবে না, কিংবা কোন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা করা কিংবা ডিগ্রী, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট প্রদান করা যাইবে না।’

এক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করার পর অবৈধভাবে স্থাপিত উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার গুণগত মান যাচাই ও ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত সমস্যা দূরীকরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে বন্ধ করে দেয়াই চূড়ান্ত সমাধান নয়। এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রোগ্রামের মান সম্পর্কে এক্রিডিটেশন কাউন্সিল-এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হলে কেহ প্রতারিত হবে না- যারা ভর্তি হবেন তারা জেনে শুনেই ভর্তি হবেন।

ইউজিসি’র অবৈধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা কি চিন্তা করছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যাপকভাবে না হলেও অতীতেও অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অননুমোদিত প্রোগ্রামে ভর্তি না হওয়ার জন্য এবং এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। অবৈধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার্থীরা সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরি পাবেন না। কিন্তু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা থাকার কথা নয়। আমরা উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে আমাদের আইন অনুযায়ী বৈধ নয় বলে চিহ্নিত করেছি; কিন্তু এগুলো বন্ধ করতে বলিনি। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত ছাত্র-ছাত্রীরা ইচ্ছে করলে অনুমোদিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তির চেষ্টা করতে পারেন। তাছাড়া কোন খোঁজখবর না নিয়ে হঠাৎ করে যে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরবর্তীতে উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই সংশিøষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া উচিত। যারা সচেতন নন তারা নানাভাবেই সমস্যায় পড়তে পারেন। যেমন অনেকে অবৈধভাবে স্থাপিত সমিতির ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, আদম ব্যবসায়ীর পাল্লায় পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন। কাজেই উচ্চশিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে খোঁজখবর নেয়া প্রত্যেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক বলে আমি মনে করি।

ইউজিসি’র মতো প্রতিষ্ঠান থাকতে কিভাবে এতোগুলো অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলো? তাহলে কি আমরা ধরে নিব ইউজিসি’র কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ ছিল? এর উত্তরে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার অনুমোদনপত্র প্রদান করা হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মঞ্জুরী কমিশনে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে) শুধুমাত্র সুপারিশ বা মতামত দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে অনুমোদিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করা। দেশের কোথায় কোন স্থানে কোচিং সেন্টার গড়ে উঠলো, অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলো তা দেখার দায়িত্ব সরকারের তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অধ্যাদেশের কোন ধারাতেই এই দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উপর ন্যস্ত করা হয়নি। বিগত কোন সরকারই অবৈধভাবে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা অন্ততপক্ষে জনসাধারণকে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেছি- এখন উক্ত অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ও পড়ালেখা করা না করা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের ব্যাপার।

বিগত জোট সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেয় সে খসড়া প্রস্তাব দু’বছর ঝুলে আছে এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আইনটি দু’বছর ঝুলে থাকার কারণ পূর্ববর্তী সময়ের সংশিøষ্ট ব্যক্তিরাই ভাল বলতে পারবেন।

বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি সম্পর্কে বলেন, আমাদের আইনের কোথাও বলা হয়নি যে, এদেশে কোন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। আমরা শুধুমাত্র বলছি যে, এ ধরনের কার্যক্রম আইন সম্মতভাবে পরিচালিত হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পূর্বেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ল্যাব, লাইব্রেরি সুবিধা দেখা হতো তবে- এই বিষয়গুলো দেখার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছিল না। বর্তমানে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে এগুলো দেখা হয়। যেমন- প্রথমে সিলেবাসের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া হয়-মতামতের ভিত্তিতে সিলেবাস অনুমোদন কিংবা সংশোধন করার জন্য বলা হয়। সিলেবাস অনুমোদন দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি যদি বিজ্ঞান বা কারিগরি বিষয়ক হয় তাহলে ল্যাবরেটরি অভিজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করানো হয়। সে সাথে লাইব্রেরিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পর্যাপ্ত সংখ্যক পুস্তক আছে কিনা তা দেখা হয়। সর্বশেষ নির্ধারিত সংখ্যক উপযুক্ত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়কে পরামর্শ দেয়া হয়। শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাচাই শেষে সব কিছু ঠিক পাওয়া গেলে বিষয় বা প্রোগ্রামটি পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হয়।

সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিল ও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা ঐ সব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চাইতে এসেছিলেন ইউজিসি’র কাছে। তবে তারা জানিয়েছেন, তাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এদেশের কার্যক্রম অনেকটা কোচিং সেন্টারের মতো। এ ব্যাপারে তারা আরো খোঁজখবর নিয়ে তাদের এফিলিয়েশন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে ইউজিসি’কে অবহিত করবেন।

তিনি জানান, বিগত জোট সরকারের আমলে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু আমরা মনে করি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধন আইনের ধারা-৫ বহাল রেখে কোন নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে আইনের দৃষ্টিতে তা বৈধ বিবেচিত হবে না। বিদ্যমান আইনের অধীনে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বৈধতা অর্জন করতে পারে বলে আমি মনে করি।

‘ও‘ লেভেল ‘এ’ লেভেল এর পরীক্ষা ও শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেলে পাঠদানের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের কর্মপরিধির আওতায় আসে না- কাজেই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

যেসব শিক্ষার্থী সমমান চান না তারা কেন সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা পূর্বেই বলেছি যে সব শিক্ষার্থীর সরকারী চাকরিতে বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির কোন আগ্রহ নেই তাদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী কোন সমস্যা নয়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে কোন কোন নিয়োগদাতা সার্টিফিকেট দেখতেই চান না। তারা ইন্টারভিউ এর মাধ্যমে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করে চাকরি দিয়ে থাকেন। তাছাড়া আমরা উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে বন্ধ করার জন্য বলিনি।

অনেকে অভিযোগ করেন এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে যাচাই বাছাই করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দÿ জনশক্তি ইউজিসি’র নেই। এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মনে করি অনুমোদিত ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে দায়িত্ব পালনের জন্যই লোকবল আরো বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। বস্তুতপক্ষে এক্রিডিটেশন কাউন্সিল- এর অবর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ স্বল্পতম সংখ্যক লোকবল (৮ জন) নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের (নতুন বিশ্ববিদ্যালয়) এবং অনুমোদিত বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রোগ্রাম এক্রিডিটেশনের কাজ করে যাচ্ছে। অনুমোদিত এই ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত অবৈধ ঘোষিত ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণ, মান যাচাই করার মতো লোকবল সত্যিকার অর্থেও বর্তমানে আমাদের নেই। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগে লোকবল বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদÿতা বাড়ানোর জন্য দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। ২০ বছর মেয়াদী উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দÿতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসন সংখ্যা ২৬,৯৬৯টি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা ১,৪১,৬০৯টি (৩১ ডিসেম্বর ২০০৬ সালের তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী)। ভর্তির শতকরা হার ৮.১৮ ভাগ। যারা ভর্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় তাদের শতকরা হার ৯১.৮২ ভাগ। উল্লেখ্য যে, ভর্তি সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের একটি বৃহৎ অংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করে।

ইদানিং দেখা যায়, সময় ও যুগের চাহিদার কারণে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চমকপ্রদ সব বিভাগ খুলছে। এ বিভাগগুলোর ইউজিসি’র অনুমোদন আছে কিনা, ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে জানার উপায় কি? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইদানিং কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোন প্রোগ্রাম চালু করেছে কিনা সে সংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের স্মারক অনুযায়ী বিভিন্ন কোর্স/প্রোগ্রাম অনুমোদনের জন্য কমিশনে প্রয়োজনীয় ফি সহ প্রস্তাব পেশ করে থাকে। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত কোন কোর্স/প্রোগ্রাম খোলা ও পরিচালনা করার প্রবণতা এখন নেই বললেই চলে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারী করার পর এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কমিশনে এসে কিংবা ফোনের মাধ্যমে সাবজেক্টের অনুমোদন সম্পর্কে জেনে নিচ্ছেন। এছাড়া আমরা বলেছি কমিশনের সংস্কার হবে। সংস্কারের পর আমরা এ ধরনের তথ্য ওয়েব সাইটে দিতে পারবো। সেখান থেকে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও অভিভাবগণ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

আমরা আরো নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান পর্যবেÿণ করছি। যাতে সবাই বেধে দেওয়া নিয়মনীতিগুলো মেনে চলে। আশার কথা হচ্ছে ইতোমধ্যেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে যথেষ্ট সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে। আমরা চাই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূর্ণাঙ্গরূপে ও সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নূন্যতম মান বজায় রাখুক। ০

০ মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ
অলংকরণ মোঃ সাজ্জাদ হোসেন খান

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s