ক্লাস শুরুঃ আবার মুখরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, লেজুড় রাজনীতি নয়, শান্তির ক্যাম্পাস চায় ছাত্র শিক্ষকরা

লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে বার বার সহিংস ঘটনা ঘটে। এর স্থায়ী অবসান দরকার

।। সাইদুর রহমান ।।

প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর ছাত্র-শিক্ষকদের পদচারণায় আবার মুখরিত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গতকাল রবিবার একযোগে ঢাকা, রাজশাহী, শাহজালাল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। খোলার প্রথম দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, আমরা শান্তির ক্যাম্পাস চাই। ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রাখতে হলে অবিলম্বে শিক্ষাঙ্গন থেকে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে ৭৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের সংশোধন করা অপরিহার্য। তবেই ক্যাম্পাসে সহিংস ঘটনার স্থায়ীভাবে অবসান হবে।

গত ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এক এক করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্লাস চালু হয়েছে। গতকাল ছাত্র-শিক্ষকদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল সকাল মধুর ক্যান্টিনে এসে উপস্থিত হন ছাত্রদল-ছাত্রলীগের ও বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। সকালে ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি কম হলেও লাইব্রেরিতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে যোগ দেয় শিক্ষার্থীরা। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষদের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন বর্ষের স্থগিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হবে ৫ নভেম্বর থেকে। এর আগে ৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির ফরম বিতরণ করা হবে। চলবে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত। ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ৭ ডিসেম্বর। ‘খ’ ইউনিটের পরীক্ষা ২৮ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ১১ জানুয়ারি। ‘গ’ ইউনিটের পরীক্ষা ৩০ নভেম্বর এবং ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন পর ক্যাম্পাস খোলায় ছাত্র-ছাত্রীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে পরস্পরের মধ্যে নারকেল নাড়ণ্ড বিতরণ করে। সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মৌসুমী ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাস বন্ধ থাকুক এমন কোন পরিস্থিতি আমরা চাই না। শিক্ষার্থীদের আগমনে ক্যাম্পাস চিরচেনা রূপ ফিরে পেয়েছে। সহিংস ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও ক্যাম্পাসে কোন পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি। প্রবেশের বিভিন্ন পথে পুলিশের অবস্থান ছিল। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা হল ক্যাম্পাসের প্রাণ। ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতা, গতিশীলতা, স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

এদিকে কারাবন্দি ছাত্র-শিক্ষকদের মুক্তির জন্য দুপুরে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ক্যাম্পাস সচল রাখার স্বার্থে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মানবেন্দ্র দেবসহ অন্যদের মুক্তির দাবি করেন নেতা-কর্মীরা। এর আগে ভিসির সঙ্গে দেখা করে সাংবাদিকতা বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র দীন ইসলামের পিতা সন্তানের মুক্তির দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য শিক্ষকরা বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে সহিংস ঘটনা দূর করতে হবে। এর জন্য ক্যাম্পাসে কোনভাবে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ অধ্যাদেশের কিছু পরির্তন দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন খান বলেন, ক্যাম্পাস সচল রেখে সেশন জট দূর করতে হবে। বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাস সচল রাখতে সহিংস ঘটনা পরিহার করার কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. শহীদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সেশন জটের জন্য সহিংস ঘটনা দায়ী। এটির স্থায়ী সমাধান জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক কষ্ট করে অভিন্ন সেমিস্টার চালু করেছিলাম। কিন্তু দুই মাস বন্ধের ফলে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে ৭৩ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সংশোধন জরুরি।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, শিক্ষা কার্যক্রম বিঘিœত করলে হবে না। সবাইকে একযোগে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য কাজ করতে হবে। সেশন জট নিরসনের জন্য ছাত্রদের অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে নিয়মনীতি মেনে শিক্ষকদের ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে বলা হয়েছে। অবিলম্বে লাইব্রেরির সমস্যা দূর করা ও হলের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবেন বলে তিনি জানান।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানান, ঈদুল ফিতর ও দুর্গাপূজার দীর্ঘ ২০ দিনের ছুটির পর গতকাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। যথারীতি ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্যাম্পাস শান্ত থাকায় ক্যাম্পাসে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা চোখে পড়েনি।

দৈনিক ইত্তেফাক
অক্টোবর ২৯, ২০০৭, সোমবার : কার্তিক ১৪, ১৪১৪

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s